হাইব্রিড ওয়ার বা মিশ্র কিংবা সঙ্কর যুদ্ধের অস্ত্র হয়ে উঠেছে অভিবাসন। যুদ্ধাস্ত্রের এমন প্রয়োগের কথা সরাসরি ভাবেও ভাবতে পারেননি আড়াই হাজার বছর আগের চীনা সমরবিদ সানজু। চূড়ান্তভাবে ঘায়েল করার আগে শত্রুকে অর্থনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক নানা কৌশল প্রয়োগ করে নাস্তানাবুদ করার পদ্ধতি বাতলে গেছেন তার কালজয়ী রণকৌশল বিষয়ক বই ‘The Art of War’ এ। কিন্তু সেখানে অভিবাসন অস্ত্রের কথা নেই।
প্রতিপক্ষ যখন শক্তিশালী হয় তখন তাকে প্রচলিত বা ঐতিহ্যবাহী যুদ্ধের ময়দানে নিয়ে জব্দ করা যায় না। এমন পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে বদলে যায় যুদ্ধের ধরন। আশ্রয় নিতে হয় ‘হাইব্রিড ওয়ার’ বা মিশ্র কিংবা সঙ্কর যুদ্ধের। এতে নাস্তানাবুদ হয় কিংবা বিপাকে পড়ে প্রতিপক্ষ।
আজকের ইউরোপে এমনই এক ‘যুদ্ধ’ চলছে। মধ্যপ্রাচ্যের অসহায় অভিবাসন প্রত্যাশীদেরকেই এমন যুদ্ধের হাতিয়ার বানানো হয়েছে। রাশিয়া প্রভাবিত বেলারুশ প্রয়োগ করছে এ হাতিয়ার। তার প্রতিপক্ষ হলো পোল্যান্ড। কিংবা বৃহত্তর অর্থে ইউরোপীয় ইউনিয়ন।
ফ্যাশন জগতে খুব চালু একটা কথা হলো, ঘুরে ফিরে সেই পুরানোতেই ফেরে। অভিবাসনকে অস্ত্র বানানোর কৃতিত্ব কেবল বেলারুশের নয়। প্রাচীন রণ বিশারদ সানজু’র কেতাবে এ হাতিয়ারের উল্লেখ না থাকলেও অনেককাল ধরেই এটি ব্যবহার হচ্ছে।
‘উইপনস অব মাস মাইগ্রেশন’ গ্রন্থে এমন অস্ত্র প্রয়োগের বর্ণনা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষাবিদ এবং লেখক কেলি গ্রিনহিল। ১৯৫০’এর দশকের পর এমন অস্ত্র অন্তত ৭৬ দফা প্রয়োগের হিসাব দেওয়া হয়েছে ‘উইপনস অব মাস মাইগ্রেশন’ এ। এর চেয়েও বেশি এমন অস্ত্র প্রয়োগের ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে স্বীকার করেন তিনি।
পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ বাংলাদেশে অভিযান শুরুর পর এক কোটি বাংলাদেশি সীমান্ত ডিঙিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। নয়। ‘বাঙ্গালি বিদ্রোহীদের’ (গ্রন্থের লেখক এ শব্দটি ব্যবহার করেছেন) প্রতি সমর্থন বন্ধে নয়াদিল্লিকে বাধ্য করতে এ পথ বেছে নেওয়া হয়।
১৯৮০’এর ম্যারিয়েল বোটলিফটেরে ঘটনায় (১৯৮০’এর ১৫ এপ্রিল থেকে ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত কিউবাবাসীদের গণঅভিবাসন ম্যারিয়েল বোটলিফট নামে পরিচিত। কিউবার ম্যারিয়েল বন্দর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমিয়েছিল কিউবাবাসীরা। ১৯৮০’র অক্টোবরের শেষ দিকে ওয়াশিংটন এবং হাভানা সরকারের মধ্যে পারস্পরিক চুক্তির মাধ্যমে ম্যারিয়েল বোটলিফটের সমাপ্তি ঘটে। অবশ্য ততদিনে ১লাখ ২৫ হাজার অভিবাসীকামী কিউবান পা রেখেছে ফ্লোরিডায়) কিউবাবাসীদেরকে দলে দলে আমেরিকায় চলে যাওয়ার অনুমতি দেন ফিডেল কাস্ত্রো। কেবল অনুমতি দেননি বরং তাদেরকে যুক্তরাষ্ট্রে যেতে উৎসাহিতও করা হয়েছিল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের কাছ থেকে রাজনৈতিক ছাড় আদায়ের আশায় এ কাজ করা হয়। প্রথমদিকে অভিবাসন প্রত্যাশীদের স্বাগত জানাতে দ্বিধা করেনি মার্কিন সরকার। অভিবাসীকামী মানুষের জোয়ার দ্রুত ফুলে ফেঁপে জলোচ্ছ্বাস হয়ে দেখা দিলে হুঁশে ফেরে ওয়াশিংটন।
অভিবাসন নিয়ে ‘গাজোয়ারি’ হুমকিও শোনা গেছে কখনো কখনো। হুমকিদাতারা তাদের মতলব নিয়ে কোনো রাখঢাকের মধ্যেই যাননি। এভাবেই ইউরোপের অভ্যন্তরে নিহিত জাতিগত উত্তেজনা নিয়ে খেলার চেষ্টা করেন লিবিয়ার নেতা মুয়াম্মার গাদ্দাফি। তিনি ২০১০ সালে অবৈধ আফ্রিকান অভিবাসন বন্ধ করতে বছরে ৫ বিলিয়ন ইউরো দাবি করেন তিনি। গাদ্দাফি বলেন, “আগামীকাল ইউরোপ হয়তো আর ইউরোপীয় থাকবে না, এমনকি কালোরাও হয়তো থাকবে না (তার চেয়েও খারাপ হতে পারে), কারণ লাখ লাখ মানুষ দলে দলে ইউরোপে ঢুকতে চায়।”
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তৈয়ব এরদোগান দেশটিতে বসবাসকারী ৪০ লাখ শরণার্থীর বন্যায় ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি বারবার দিয়েছেন। গত বছরই তুর্কি কর্তারা হাজার হাজার শরণার্থীকে বাসে করে গ্রিসের স্থল সীমান্তের কাছাকাছি নিয়ে যায়। এর সূত্র ধরে গ্রিক সীমান্তরক্ষীদের সঙ্গে তুর্কি বাহিনীর উত্তেজনাপূর্ণ সংঘর্ষও ঘটে।
এরদোগানের কণ্ঠে অভিযোগ শোনা গেছে যে তুরস্কের ঘাড়ে অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইইউ এ বাবদ নিজ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করছে না। শেষ পর্যন্ত ২০১৬’তে ইইউর সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে এ ঘটনার রফা হয়। চুক্তি অনুযায়ী, ৬০ লাখ ইউরোর সাহায্য দেওয়া হবে তুরস্ককে। বিনিময়ে ইউরোপমুখো শরণার্থীদের প্রবাহ বন্ধ করবে তুরস্ক। এসব শরণার্থীদের সিংহভাগই সিরীয়। তবে স্বীকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের ইউরোপে ঢুকতে দেওয়া হবে বলে চুক্তিতে স্বীকার করা হয়। কিন্তু, অরণ্যে রোদন, সে প্রতিশ্রুতির বেশিরভাগ এখনও পুরো করেনি ইউরোপ।
“(শরণার্থীদের) জন্য তুরস্ক দরজা খুলে দেওয়ার পর অনেকেই বলেছে, ‘দরজাগুলো বন্ধ করে দিন’,” এরদোগান সে সময়ে বলেন, “জবাবে আমি বলেছি, দরজা এখন খোলা। এবারে আপনাদেরকে (ইউরোপকে) নিজ দায়িত্বের হিস্যা নিতে হবে।”
নিজ নিজ, ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লক্ষ্য হাসিলের জন্য একইভাবে কড়া স্বরে হুমকি দিয়েছে আরো অনেক দেশ। মে মাসে, মরক্কোর কর্তৃপক্ষ হাজার হাজার অভিবাসীকে উত্সাহিত করেছিল জিব্রাল্টার প্রণালীতে অবস্থিত স্প্যানিশ উত্তর আফ্রিকার সেউতা বন্দর ঢুকতে। বন্দরে ঢোকার জন্য সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া ঘুরপথে সাঁতরে পার হতে হয়েছে। কেবল অভিবাসী নয়, মরক্কোর নাগরিকদেরও এভাবে স্পেনের ছিটমহলটিতে ঢুকতে অকাতরে উৎসাহের যোগান দিয়েছে রাবাত। এমনকি মরক্কো থেকে গুজব ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, বিশ্বখ্যাত ফুটবলার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ছিটমহলটিতে ম্যাচ খেলবেন। এমন উপাদেয় প্ররোচনার ফাঁদে পড়ে প্রতারিত হয়েছে অনেকেই।
মরক্কো হঠাৎ করে কেনো স্পেনের বিরুদ্ধে এমন লোকদেখানো হামলায় নামল? পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কো নিজ সার্বভৌমত্ব দাবি করে আসছে। সেখানকার স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা ব্রাহিম গালি’কে জরুরি চিকিৎসার অনুমতি দেয় স্পেন। আর এতে ক্ষুব্ধ হয় রাবাত। স্পেনের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্য অভিবাসন প্রত্যাশীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারে নামে মরক্কো।
এদিকে, গেল ট্রাম্পের সরকার এর আগে পশ্চিম সাহারার ওপর মরক্কোর সার্বভৌমত্বের দাবিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মাদ্রিদকেও একই পন্থা গ্রহণ করতে মাসের পর মাস ধরে চাপ দিচ্ছিল মরক্কো।
মরক্কোর পানিসীমা থেকে স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে অভিবাসীদের আগমন প্রচণ্ডভাবে বেড়ে যায়। স্প্যানিশ এক কর্তা বলেন “স্পেনকে মনোভাব বদলাতে বাধ্য করতে পারেনি মরক্কো। সুতরাং এবারে মাদ্রিদের ওপর চাপ দেওয়ার জন্য সঙ্কর যুদ্ধের রূপকেই বেছে নেয় তারা।”
মরক্কোর চাপের মুখে মাথা নত করতে অস্বীকার করে স্পেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ পরে দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাল্টে দেন।
উত্তরে, আফ্রিকা এবং স্পেনের মধ্যে জিব্রাল্টার প্রণালীর সংক্ষিপ্ত ১৩ কিলোমিটার দূরত্বটি অভিবাসন অস্ত্রের মুখে ইউরোপের দুর্বলতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। ভূখণ্ডগত অবস্থানের জেরে ইরাক, আফগানিস্তান এবং লিবিয়ার গোলযোগের প্রভাব বর্তায় ইউরোপের ওপর। বাংলা প্রবাদের বিষফোঁড়ের মতোই এর সাথে তুলনামূলকভাবে অল্প দূরত্বের মধ্যে সম্পদ এবং সুযোগের বিশাল বৈষম্যের প্রভাবও পড়ছে ইউরোপ।
এ নিয়ে কথা বলতে যেয়ে স্প্যানিশ কর্তা বলেন, “ইউরোপকে ঘিরে রেখেছে এমন সব প্রতিবেশী যারা সমস্যার মধ্যে দিনাতিপাত করছে এবং এটি ইউরোপের জন্য সংবেদনশীল হয়ে দেখা দিয়েছে। তিনি আরো বলেন, “এবং আমাদের প্রতিবেশীদের প্রতিবেশীরা আরও বেশি সমস্যার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে।”
[চলবে...]
[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]
আরো পড়ুন:
অভিবাসন যখন হয়ে উঠে যুদ্ধের অস্ত্র
