Loading...

অভিবাসন যখন হয়ে উঠে যুদ্ধের অস্ত্র

| Updated: December 18, 2021 19:47:53


বেলারুশ-পোলিশ সীমান্তের কাছে বেলারুশের গ্রোডনো অঞ্চলে আটকে পড়া অভিবাসীরা — রয়টার্স ফাইল ছবি বেলারুশ-পোলিশ সীমান্তের কাছে বেলারুশের গ্রোডনো অঞ্চলে আটকে পড়া অভিবাসীরা — রয়টার্স ফাইল ছবি

সমরবিদ্যার কথা বলতে গেলেই অনিবার্যভাবে সানজুর নাম উঠে আসবে। চীনের এই রণবিদ প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে লিখেছেন 'The Art of War'. যুদ্ধবিদ্যার ধ্রুপদী বইটিকে পুরানো বা বাতিল করতে পারেনি মহাকালের মহা আক্রোশ। যুদ্ধের আলোচনায় আজও প্রাসঙ্গিক হয়েই আছে এ বই। শত্রুকে দিশেহারা করে তুলতে, ঘায়েলের রাজপথ প্রশস্ত করতে অর্থনৈতিক বা মনস্তাত্ত্বিক রণকৌশলের বিবরণ রয়েছে এতে। কিন্তু, এমন কাজে অভিবাসী জনগণ বা অভিবাসনকে রণাস্ত্র হিসেবে প্রয়োগের কথা ভাবতে পারেননি সানজুও।

ঐতিহ্যগত যুদ্ধের পথ সবসময়ই রাজনৈতিক মতলব অর্জনে সহায়তা করে না। এমন পরিস্থিতিতে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে যে রণকৌশলকে বেছে নেওয়া তাই হলো ‘হাইব্রিড ওয়ার,’ বা মিশ্র কিংবা সঙ্কর যুদ্ধ।

ইউরোপের দেশে দেশে মতবিরোধ রয়েছে। রয়েছে মত পার্থক্য। এই বিভাজনের পাশাপাশি বিরাজ করছে অভিবাসীদের নিয়ে অমূলক ভীতি। এখন ফায়দা হাসিলের মতলবে এই দুইকে প্রয়োগ করা হচ্ছে। হালে, ইউরোপে সরকারগুলো মনে হয় এক ‘সঙ্কর যুদ্ধে’ জড়িয়ে পড়েছে।। এ যুদ্ধে হাতিয়ার হয়ে উঠেছে চালচুলোহীন অসহায় অভিবাসী মানুষ আর অভিবাসন প্রক্রিয়া। লন্ডন থেকে বেন হাল, ব্রাসেলস থেকে স্যাম ফ্লেমিং এবং ওয়ারশ থেকে জেমস শোটার চলমান এ ‘যুদ্ধ’ নিয়ে লিখেছেন।

পোল্যান্ড সংলগ্ন বেলারুশ সীমান্তে আটকে পড়া একদল অভিবাসীকে দেখতে গিয়েছিলেন আলেকজান্ডার লুকাশেঙ্কো। অভিবাসী দলটির সীমান্ত পার হওয়ার তৎপরতা রুখে দেয় পোলিশ নিরাপত্তা বাহিনী। শীত আসার আগে আগে ঘটে এ ঘটনা। উপায়ন্তরহীন আদম সন্তানরা পূর্ব ইউরোপের কঠোর শীতের হাত থেকে প্রাণ রক্ষার তাগিদে ব্রুজগির একটি গুদামকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হয়। এখানেই তাদের দেখতে যান বেলারুশের স্বৈরশাসক লুকাশেঙ্কো। তিনি বলেন, “আপনারা যদি পশ্চিমে যেতে চান, আমরা আপনাদের গলা টিপে ধরব না। পাকড়াও করব না। বা মারব না। এটা একান্তভাবেই আপনাদের ইচ্ছা। (সীমান্ত) পার হোন।”

“(সীমান্ত) পার হয়ে ঢুকুন। এটাই গোটা দর্শন। এ কথা ভালোভাবেই জানি যে, আমি যা বলছি তাতে সবাই খুশি হবেন না। বিশেষ করে দেশের বাইরের মানুষদের কথা বলছি। সে সাথে এটিও সত্য যে তাদের সত্য জানা উচিত।” গত মাসের ২৬ তারিখে ব্রুজগির গুদাম পরিদর্শনকালে এসব কথা বলেন তিনি। তার এ বক্তব্য দেওয়ার সময় চিত্র ধারণ করা হয়েছে। প্রচার করা হয়েছে টেলিভিশনে।

লুকাশেঙ্কো এভাবেই এক মানবিক সংকটকে তাল দিচ্ছেন বলে অভযোগ আছে। ইউরোপীয় কর্তারা অভিযোগ তুলেছেন, তার সরকার মধ্যপ্রাচ্যের অভিবাসীদের বেলারুশ ঢোকাকে সহজ করে দিয়েছে। তারপর এসব মানুষকে বেলারুশ সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। চালচুলোহীন, বাস্তুহারা এসব মানুষকে, দায় বোধের কোনো তোয়াক্কা না করে, অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের এ ঘটনাকেই জবরদস্তিমূলক কূটনীতির সবচেয়ে স্পষ্ট এবং সবচেয়ে সাম্প্রতিক উদাহরণ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।

অভিবাসন-অস্ত্রের প্রয়োগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকে লক্ষ্য করে এ অস্ত্র প্রয়োগ করা হচ্ছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর জনগণের মধ্যে চলমান রাজনৈতিক বিভাজন এবং অনিয়ন্ত্রিত অভিবাসন নিয়ে এক ধরনের ভীতি বিরাজ করছে। একে কাজে খাটিয়ে স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্য নিয়েই তা প্রয়োগ করা হচ্ছে। এতে ফল দাঁড়াচ্ছে এই যে, অভিবাসন এবং আশ্রয়প্রার্থীদের প্রতি ইইউর মনোভাব কঠোর থেকে কঠোরতর হচ্ছে। ইইউ’এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাদের নিজ নিজ সীমানা জোরদার করার পথ খুঁজছে। তারা খুঁজছে বাস্তুহীন লোকদের ইইউতে ঢোকা ঠেকানোর নতুন নতুন উপায়। পোল্যান্ডের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্সিন প্রজাইদাকজের মনে করেন, এমন অস্ত্র প্রয়োগের লক্ষ্য হল “জনগণের আবেগকে ঝাঁকি দিয়ে আমাদের দেশের সহনশীলতার সক্ষমতাকে পরীক্ষা করে দেখতে চাওয়া।”

ইউরোপের সরকারগুলোকে এক দিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত অভিবাসন ঠেকানোর বিষয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। পাশাপাশি, সাইবার হামলা এবং গুজব বা অতথ্য (ডিজইনফরমেশন) ছড়ানোসহ সামাজিক এবং রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার মতো বিষয়গুলো প্রতিহত করার ভাবনাও রয়েছে তাদের। সাইবার হামলা, অতথ্যের বিস্তার এবং অভিবাসন অস্ত্রকে সঙ্কর যুদ্ধ নীতির পরিশীলিত সামরিক কৌশলের সফল অংশ করে তুলেছে মস্কো। এছাড়া, অন্যান্য অনেক দেশও একই তৎপরতাকে অনুসরণ করছে।

ইইউ’এর পররাষ্ট্রনীতির প্রধান জোসেপ বোরেল গত মাসে ইইউ-এর নতুন “কৌশলগত কম্পাস” বা পররাষ্ট্রনীতি-কৌশল উন্মোচন করার সময় বলেন, “যুদ্ধ এবং শান্তির মধ্যে প্রচলিত বা ধ্রুপদী (ক্লাসিক) পার্থক্য কমছে।”

“এটি আর সাদা-কালো নয়। বিশ্ব এখন সঙ্কর পরিস্থিতিতে ভরে গেছে। যেখান থেকে আমরা প্রতিনিয়ত ভয়ভীতি এবং জবরদস্তিপূর্ণ মধ্যবর্তী গতিশীল প্রতিযোগিতার মুখে পড়ছি। আমরা আজ পোল্যান্ড এবং বেলারুশের সীমান্তে যা দেখছি এ হলো, তারই আদর্শ একটি উদাহরণ।”

অভিবাসন নিয়ে স্পর্শকাতরতা কেবল ইউরোপেই দেখা যায়, বিষয়টা এমন না। তবে ইউরোপে রয়েছে কিছু অনবদ্য বৈশিষ্ট্য। আর লুকাশেঙ্কোর মতো বৈরীভাবাপন্ন ব্যক্তিরা এগুলোকে কাজে লাগানোর সবক নিয়েছে।

ইউরোপের জাতীয় সরকারগুলোর প্রাথমিকভাবে নিজ নিজ দেশের বহির্সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব রয়েছে। তবে ইইউভুক্ত বেশিরভাগ দেশের  অভ্যন্তরে ভ্রমণের সময় সীমান্ত পারাপারের বিষয়টি টেরই পাওয়া যায় না। অভ্যন্তরীণ এই যাতায়াত প্রবাহ পরিচালনার কোনও ব্যবস্থাপনা নেই। নেই আশ্রয়প্রার্থীদের বিষয়ে দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়ার কোনও কার্যকর ব্যবস্থা ।

ইউরোপে ঢোকার পথ হিসেবে বা চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে ইইউভুক্ত কোনো কোনো সদস্য দেশ অন্যদের তুলনায় অধিকতর পছন্দসই হয়ে উঠেছে। এসব দেশের মধ্যে বিভাজন এবং পারস্পরিক মত পার্থক্য রয়েছে। ফলে বিষয়টি নেতাদের কাছে রাজনৈতিকভাবে তেজস্ক্রিয় হয়ে দেখা দিয়েছে।

রোমের ইন্সটিটিউট ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের ডিরেক্টর এবং হার্ভার্ডে বহিরাগত অধ্যাপক বা ভিজিটিং প্রফেসর নাতালি তোকি বলেন, “দুর্বলতা হিসেবে পরিচিত আমাদের কিছু বিষয়কে বেছে নিয়েছে বেলারুশ।” “এটিই পুরোপুরি সঠিক” বলে অভিমত ব্যক্ত করেন তিনি।

ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস-প্রেসিডেন্ট মার্গারিটিস শিনাস বলেন, বেলারুশ পর্বটি ইইউ জুড়ে রাজনৈতিক আবহাওয়ার পরিবর্তনের একটি রূপকে তুলে ধরেছে। অভিবাসন সমস্যা গোটা ইইউকে কতোটা স্পর্শ করেছে তাই প্রকাশ পেয়েছে এর মাধ্যমে। শাপে বর হওয়ার মতোই শেষ পর্যন্ত বিষয়টি ইইউ’র দেশগুলোতে সংহতির বৃহত্তর বোধ উস্কে তুলতে পারে।

অভিবাসন সত্যিই সাদামাটা ধরণের সমস্যা কিনা তা নিয়ে ইইউ’এর কিছু কিছু অংশে আগেও সন্দেহ ছিল বলে জানান তিনি। তিনি আরো বলেন, “এবারে বেলারুশের হামলার মধ্য দিয়ে ইইউ-নাগরিকদের মতকে জাগিয়ে তোলা হয়েছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে একটি বিন্দুতে সংহত করতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। আমরা দেশের ভেতর থেকে এর  মোকাবেলা না করতে পারলে কখনোই বাইরে থেকে মোকাবেলা করতে পারব না।”

[চলবে...]

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস অবলম্বনে]

syed.musareza@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic