অব্যবহৃত প্রকল্প সাহায্য চার হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে


এফ এইচ এম হুমায়ন কবীর | Published: February 13, 2021 17:50:20 | Updated: February 14, 2021 17:34:39


অব্যবহৃত প্রকল্প সাহায্য চার হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে

বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা প্রকল্প সহায়তা হিসেবে প্রাপ্ত অর্থ খরচ করতে না পারার কারণে গত ডিসেম্বরে এসে এসব অব্যবহৃত প্রকল্প সহায়তার পরিমাণ চার হাজার ৮০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

এই পরিমিাণ অর্থ দিয়ে দুই বছরের জন্য দেশের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) ব্যয়ভার মেটানো যায়। ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য সংশোধিত এডিপির পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৩০০ কোটি ডলার । আর চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের এডিপি দুই হাজার ৫৩০ কোটি ডলার।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাষ্ট্রীয় অনেক সংস্থা সহায়তার অর্থ ব্যবহার করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে তা ক্রমাগত জমে যাচ্ছে বলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) একজন উর্ধতন কর্মকর্তা এফই-কে জানিয়েছেন।

বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) জাপান ও চীনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন অংশীদার সাধারণ মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ ও অনুদান হিসেবে বিদেশি সহায়তা দিয়ে থাকে।

ইআরডির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯-২০ অর্থবছর (এফওয়াই) শেষে অছাড়কৃত বিদেশি সহায়তার পরিমাণ ছিল চার হাজার ৮৮২ কোটি (৪৮.৮২ বিলিয়ন) ডলার।

ইআরডি পরিসংখ্যান আরো দেখায় যে অর্থবছর শেষে নতুন প্রতিশ্রুত সহায়তার পরিমাণ ছিল ৯৮০ কোটি ডলার যেখানে সর্বোচ্চ ৬২০ কোটি ডলার কাজে লাগানো হয়েছে। এটি বার্ষিক ৭৫০ কোটি ডলার লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে খানিকটা কম।

ইআরডি কর্মকর্তারা বলেছেন, চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) প্রতিশ্রুত পরিমাণের চেয়ে বিতরণ বেশি হওয়ায় অব্যবহৃত বিদেশি তহবিলের পরিমাণ খানিকটা কমেছে।

ইআরডি অনুযায়ী, আলোচ্য ছয় মাসে উন্নয়ন সহযোগীরা ২৪০ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে ছাড় করেছে ২৯৯ কোটি ডলার। ফলে ডিসেম্বর নাগাদ মোট অব্যবহৃত অর্থ সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৮২৩ কোটি ডলার।

ইআরডি এক উর্ধতন কর্মকর্তা বলেন, সরকারি সংস্থাগুলোর সঠিক সময়ে ব্যবহার করতে না পারায় এত বেশি পরিমাণ বিদেশি সহায়তার অর্থ অব্যবহৃত থেকে যাচ্ছে এই সংস্থাগুলোর তহবিল সদ্ব্যবহারের দক্ষতা এখনো বাড়েনি।

তিনি আরো বলেন, উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে নির্দিষ্ট সহায়তাগুলোর সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার সুনিশ্চিত করার জন্য ইআরডি প্রতিনিয়ত বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে চলেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাগুলোর মধ্যে মন্ত্রিসভার ত্রৈমাসিক ত্রিপক্ষীয় বৈঠক অনুবিভাগ পর্যায়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এছাড়াও, উচ্চ পর্যায়ের প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা করার জন্য সচিব পর্যায়ে দ্বি-বার্ষিক সভা এবং অর্থ মন্ত্রী পর্যায়ে বার্ষিক সভা হচ্ছে।

এই কর্মকর্তা আরো জানান যে এসব উদ্যোগ ছাড়াও প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি ধাপে ধাপে তদারকি করা হয়ে থাকে।

ইআরডির পরিসংখ্যান থেকে আরো দেখা যায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছর শেষে এসে মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও অনুদানসহ অব্যবহৃত বৈদেশিক সহায়তার পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল চার হাজার ৪৫১ কোটি ডলারে।

২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের মধ্যে সরকার বছরে ৩০০ থেকে ৩৬০ কোটি ডলারের বিদেশি সহায়তা ব্যবহার করেছে। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬১০ কোটি ডলারে।

বিদেশি সহায়তার বেড়ে চলাকে বাংলাদেশের উন্নয়নের ব্যাপারে ঋণদাতাদের আশাবাদের প্রতিফলন বলেও মনে করা হচ্ছে।

ঢাকায় বিশ্ব ব্যাংকের প্রাক্তন প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেসকে বলেন যে বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের কাজ ২০২০-২১ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বরে কিছুটা গতিশীল হয়েছে। কিন্তু বৈদেশিক সহায়তাকে ঠিকমতো কাজে লাগানোর প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করার জন্য এটা এখনো পর্যাপ্ত নয়।

তিনি আরো বলেন, প্রকল্প বাস্তবায়নে দেরি এবং অক্ষমতার জন্যই বিভিন্ন দাতার প্রতিশ্রুত সহায়তা ছাড় করানো যায় না।

প্রাপ্ত সহায়তা অব্যবহৃত থেকে পুঞ্জিভূত হওয়ার কারণ হিসেবে ড. হোসেন প্রকল্প প্রণয়নে ত্রটি, ভুলভাল নকশা, জটিল জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া এবং ক্রয় ব্যবস্থা ‍ও প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত লোকবলের ঘন ঘন রদবলকে দায়ী করেন।

ইআরডি-র প্রাক্তন সচিব কাজি শফিকুল আজম এ প্রসঙ্গে বলেন, গত কয়েক বছরে সহায়তা প্রতিশ্রুতি উল্লেখযোগ্যহারে বেড়ে যাওয়ার কারণে বৈদেশিক সহায়তা বৃদ্ধির উপরও এর প্রভাব পড়েছে। তবে বিপুল পরিমাণ এ তহবিল জমে যাওয়ার প্রধাণ কারণ হচ্ছে সরকারি সংস্থাগুলোর প্রকল্প বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতা।

পরিসংখ্যান থেকে আরো দেখা যায় যে ২০০৯-১০ অর্থবছরের আগে প্রতি বছর বাংলাদেশ ১০০ থেকে ২০০ কোটি ডলারের অর্থ সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেত। ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে বাংলাদেশ প্রতি বছর গড়ে ৫০০ কোটি ডলার সহায়তা পাচ্ছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে এ পরিমাণ আরো বাড়তে শুরু করেছে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য রাশিয়া একাই এক হাজার ১৩৮ কোটি ডলার সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে ১০ বছর সময় লাগবে, কিন্তু এর সকল ঋণ চুক্তি ১২ মাসের মধ্যেই স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

kabirhumayan10@gmail.com

Share if you like